স্টেরিওটাইপ ভাঙ্গার গল্প!

A warm, cozy scene featuring a person reading a book with a cup of coffee in soft, ambient light.
Radhuni

স্কয়ারের রাধুঁনি এই অভিনব এড ক্রিয়েটিভটি বানিয়ে শহরের মোড়ে মোড়ে বিলবোর্ড আকারে বসিয়ে দিয়েছে। গতকাল অফিসে যাবার পথে মিরপুর ১০ নং থেকে এই ছবিটি তুলেছিলাম।

এই ব্র্যান্ডের আর কোন বিজ্ঞাপনে প্রটাগনিস্ট মডেল হিসেবে পুরুষকে ব্যবহার করা হয়নি, এবারই প্রথম!

পৃথিবীর বিখ্যাত সেফদের প্রায় সবাই যেখানে পুরুষ, সেখানে রান্না-বান্নায় এই উপমহাদেশে কেবলই নারীকে দেখানো হয়েছে এতদিন। এবার সে ধারণা সপাট ভেংগে দিলো রাধুঁনি তথা স্কয়ার!

আমি নিজে রান্না বান্না করাটা ভীষন উপভোগ করি। প্রবাসে প্রায় ৮ বছর আমি নিজের হাতেই রান্না করে খেয়েছি। রান্না নিয়ে আমার কিছু অত্যন্ত কার্যকর টিপসও আছে!

এড ক্রিয়েটিভের কোর মেসেজটা সুন্দর! একজন কর্মজীবি ব্যস্ত পুরুষ, যে কিনা মাল্টিটাস্কিং করেন (ফোনে কথা বলা, ফাইল দেখা, রান্না করা – তিনটাই একইসাথে চলছে), তিনিও সমান তালে শত ব্যস্ততার ভীড়েও পরিবারের রান্নাটা সেরে নিচ্ছেন।

অপরদিকে এড কপিও কিন্তু জেন্ডার নিউট্রাল রাখা হয়েছে। মানে কপি পড়ে বুঝার কোন উপায় নেই যে এটা কোন লিংগের মডেলের জন্য লেখা হয়েছে।

আমি মনে করি, রান্না-বান্না হচ্ছে একটা অতি প্রয়োজনীয় লাইফ-স্কিল। সুতরাং, এটি কোন জেন্ডার-স্পেসিফিক কাজ হতে পারে না। পরিবারের সবারই কম বেশী রান্না বান্না শেখা উচিত। যে সব নারী কিংবা পুরুষরা রান্না জানে না বলে লজ্জিত হওয়ার বদলে গর্ববোধ করে, তারা নিঃসন্দেহে অর্থব!

একই বিজ্ঞাপনচিত্র ব্যবহার করে রাধুঁনী একই ক্যাটাগরির তিনটা প্রডাক্ট দেখাচ্ছে, যা খুবই প্রচলিত চর্চা।

আদার ন্যারেটিভসঃ

১) অনেকেই বলতে পারেন, প্রডাক্টের টার্গেট অডিয়েন্স তো নারী। সুতরাং, মডেল নারী হওয়াই সঙ্গত ছিলো।

আমি বলবো, প্রডাক্টের ইউজার নারী হতে পারেন, কিন্তু টিজির সবচে বড় অংশ হচ্ছেন পুরুষরা, যারা বায়িং ডিসিশান নেন। মানে বাজারে গিয়ে ঘরের গিন্নীর জন্য রাধুঁনির মশলাটা ঘরের কর্তারাই কিনেন। (আমি স্বপ্ন গ্রোসারি থেকে ডেটা পুল করার চেষ্টা করছি। আমি জানতে চাই, গত ৬ মাসে স্বপ্নের ঢাকার সিটির সবগুলো আউটলেটে যতগুলো রাধুঁনির প্রডাক্ট বিক্রি হয়েছে, তার কত পার্সেন্ট নারী? আমি জানি স্বপ্নর কাছে এই তথ্য আছে। তারা তাদের কাস্টমারের ডেটাবেইজ নিপুনভাবে মেইনটেইন করে!)

এমনকি যারা কর্মজীবি নারী, অথবা যে সব নারী নিজেরাই নিজের সংসারের কাচাঁ-বাজার করেন, তারাও কিন্তু এই এড দেখে ভাববেন না যে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কারণঃ

ক) Brand Positioning: “রাধুঁনী” নামটা ইটসেলফ নারীবাচক নাম। এদের ব্র্যান্ড পজিশনিংও তাই! অর্থাৎ, বাজারে এটি সেভাবেই প্রতিষ্ঠিত। যে এই প্রডাক্ট নারী-বান্ধব। এর ব্যবহারকারীরাও নারী।

খ) Brand Hammering: শুরু থেকেই রাধুঁনি অনেকটা বছর ধরে নারী মডেলের মাধ্যমেই তাদের প্রডাক্ট এর এডে কাস্টমারদের মনে ক্রমাগত হ্যামারিং করে গেছে, অর্থাৎ একই ধরনের এড বার বার কাস্টামারদের দেখিয়েছেন, যাকে মার্কেটাররা বলে থাকেন – “ব্র্যান্ড হ্যামারিং”!

কিন্তু কালের বিবর্তনে তাদের ব্র্যান্ড পজিশনিং বদলায়নি, বরং এনহেন্সড হয়েছে। মানে বাংলাদেশের সকল নারীরা তো আর একযোগে ঘোষণা দেয়নি যে তারা আর রাধুনির মশলা ব্যবহার করবে না, করবে তাদের ঘরের পুরুষরা। বরং তারাও করবে, প্যারালালি পুরুষরাও করবে। মানে প্রডাক্টের টিজি বরং এক্সপান্ড হয়েছে!

উপরন্ত এই বিলবোর্ড থেকে নারীবাদীরা (সো কল্ড না, সত্যিকার) ভাবতে পারবেন যে, এতদিন বড় বড় কোম্পানীগুলো যেভাবে নিজেদের বিজ্ঞাপনে লিঙ্গ বৈষম্য করে আসছিলো, সেই যুগ অস্তমিত হতে শুরু করেছে। কিছুদিন পর হয়তো দেখবো, ডানোর গুড়া দুধের টিভিসিতেও মায়ের বদলে একজন বাবা তার সন্তানের পেছন পেছন দুধের গ্লাস নিয়ে ঘুরছেন!

গত বছরের “ব্লাক লাইভ ম্যাটারস” আন্দোলনের পর আর কোন বড় ব্র্যান্ড তাদের এডে বর্ণ বৈষম্য করার সাহস পায় না। ধারনা করছি, খুব শীঘ্রই সারা পৃথিবীতেই জেন্ডার-নিউট্রাল এড ক্রিয়েটিভের জয় জয়কার শুরু হবে।

এমনকি যে সব প্রডাক্টগুলো হাইলি জেন্ডার-স্পেসিফিক (যেমনঃ স্যানিটারী প্যাড, কনডম, রেজার, আফটার সেভ লোশন, আন্ডার গার্মেন্স ইত্যাদি) – সে সবের এডেও এমনভাবে নারী-পুরুষ উভয়কেই দেখানো হতে পারে যে, নারী-পুরুষ উভয় লিংগের টিজিই সেগুলোর সাথে নিজেদেরকে রিলেট করা শুরু করতে পারবে।

255954063 10159705027122220 5965597308907185648 N

২) কেতাদুরস্ত হয়ে অফিসিয়াল পোষাকে কেউ রান্না-বান্না করেন কি? ঘরোয়া পোষাকেও এই বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরী করা যেতো।

– না যেতো না। কারণ, তাদের মেসেজটা ছিলো একজন পুরুষ অফিসের কাজ সামলেও সে রান্না বান্নার মতো হ্যাপার কাজ সহজেই করতে পারছে রাধুঁনীর মশলার জন্য। খেয়ার করুন, তার সামনে ল্যাপটপ রাখা, হাতে ফাইল, কানে ফোন। সাধারনত এইসব কেউ ক্যাজুয়াল ড্রেসে করে না। যদি আপনি ক্রিটিক হয়ে থাকেন তবে আপনাকে বিজ্ঞাপন দেখতে হবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে, এক তরফা ভাবে নয়।

তাছাড়া এমন তো আমারো অনেক সময় হয়েছে, অফিসে যাবার জন্য রেডি হয়েছি, এমন সময় দেখি রাতের ডিনার নেই। তখণ ডিনার চড়াই চুলোয়। এর ভেতর অফিসে লেট হলো, তখন অফিস থেকে ফোন করে আমাকে জরুরী একটা ফাইলে কি আছে সেটা জানাতে বলা হয়। যে ফাইলটা আমার কাছেই ছিলো। অনেক এক্সিকিউটিভ অফিসের ফাইল সাথে করেই ঘুরেন সারাদিন।

উল্লেখ্য, রাধুঁনী তাদের রেডি মিক্স মশলা (কাবাব, চটপটি, হালিম, রোষ্ট, তেহারি, বিরিয়ানি, কোরমা, ইত্যাদি) এবং ডেজার্ট (ফিরনি) স্টক কিপিং ইউনিট (SKU)-এ বহু আগে থেকেই পুরুষ মডেল ব্যবহার করে আসছে, কারণ আমার ধারনা তাদের মূল টিজি হলো বিজি পুরুষরা [যাদেরকে প্রায়ই জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে নিজের হাতেই রান্না করতে হয়। যেমনঃ প্রবাসী পুরুষ, কর্পোরেট বিজি পুরুষ কিংবা গ্রাম থেকে শহরে আসা ছাত্র যে কিনা বুয়ার রান্নায় এখনো অভ্যস্ত হতে পারেনি।] এবং শখের পুরুষ রাধুঁনীরা, যারা মাঝে সাঝে শখ করে বউকে বা পরিবারের অন্য সদস্যদের রান্না করে খাওয়ায়!

আমার নিজের প্রবাস জীবনেও রাধুঁনীর মশলা এক বিশেষ আর্শিবাদ ছিলো। রাধুঁনির জন্য টিনেজাররাও কিন্তু একটা ভালো মার্কেট, রাধুঁনির জন্য তারাও ভালো টিজি হতে পারে। সুতরাং, অচিরেই টিন দের টিজি ধরে তারা এড বানালে আমি অবাক হবো না।

247897198 10159705024762220 8352360611089978304 N 1024x540

#breakingstereotypes
#radhuni
#malemodels
#cookinglife
#Brandvabna
#genderneutral

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *