সেদিন বন্ধুর বাসা থেকে ফেরার পথে ধানমন্ডি ২৭ এর এ্যাগোরায় গেলাম, পাস্তা কিনবো। স্প্যাগেটির একটা প্যাকেটে দেখলাম প্রাইস ট্যাগ নাই। এটেনডেন্টকে ডেকে স্পষ্ট গলায় জিগেস করলামঃ
– এক্সিকিউজ মি, এটার প্রাইস কত আর এক্সপায়েরি ডেট কবে?
– স্যার এটার প্রাইস ২২০ টাকা।
আমি চুপ করে আছি। ভাবলাম সে বুঝি আমার ২য় প্রশ্নের উত্তর মনে করার চেষ্টা করছে। তাই তাকে মনে করার টাইম দিলাম। কিন্তু সে দেখি প্রাইসটা বলেই আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকায় আছে। আমার মেজাজ সাথে সাথে চড়ে গেলো। তবু নিজেকে সামলিয়ে আবার ২য় প্রশ্নটা করলাম। তখন বল্ল – ’স্যার, দেখে জানাতে হবে।’ তার মানে হলো, প্রথমবারে যখন আমি তাকে ২য় প্রশ্নটি করেছিলাম, সে সেটা শুনেইনি মনোযোগ দিয়ে।
বাসার জন্য ফার্নিচার কিনতে যাবো, মিরপুরের শ্যাওড়া পাড়ার দোকানগুলোকে ঢুকে কোটেশন চাইলাম। সেখানেও একই অবস্থা। আইডিবি ভবনে ল্যাপটপ কিনতে গেলাম, সেখানেও কয়েকবার করে একই প্রশ্ন করা লেগেছে।
যে কোন কাষ্টমার সার্ভিসে কল দিলেও তথৈবচ। তিনটা প্রশ্ন করলে একটা বা বড়জোর দুটোর উত্তর পাই। অবধারতিভাবেই আমি সবগুলোর উত্তর পাই না। এবং দুটো প্রশ্ন করেই থেমে যায় যেন আমি পরের প্রশ্নটি করিইনি। প্রায় প্রতিটি জাগাতেই এই অবস্থা। অথচ আমি একসাথে প্রশ্ন করি বার বার প্রশ্ন করার ঝামেলা এড়াতে। তবু বারবার করতে হয়।
আমি বুঝিনা, আমি মানুষজনকে ৩টা বা ৪টা প্রশ্ন একসাথে করলে কেন শুধু প্রথমটা বা শেষটার উত্তর পাই। বাকীগুলো পুরোই ইগনোর করে। যেন প্রশ্নটা করিই-ই নি আমি। প্রশ্ন যদি ভুলে যায়, তাহলে জিগেস করে নিলেই হয়।
গত কয়েক বছরে মাত্র একবার এমন ঘটনা ঘটেছিলো। মুসলিম সুইটসের একটা দোকানে বন্ধুর জন্য কনে দেখার মিষ্টি কিনতে গিয়েছিলাম। দোকানী ছেলেটা আমার প্রথম দুটো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জিগেস করলো – ‘স্যার, আপনার আরেকটা প্রশ্ন যেন কি ছিলো?’ তার মানে হলো, সে অন্তত চেষ্টা করেছে আমার সবগুলো প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনার কিন্তু বেচারা মনে রাখতে পারেনি। কিন্তু সে ঠিকই খেয়াল করেছে যে আমি মোট তিনটি প্রশ্ন করেছিলাম। আমি ছেলেটির সেবায় মুগ্ধ হলাম। কারন এই সামান্যটুকু ব্যাপারও বেশীরভাগ লোকেই খেয়াল করেন না।
দেশের বাইরে আমি যেখানে যতগুলা প্রশ্ন করেছি, সেটা দোকানে হোক, অপিস আদালত, ইমিগ্রেশন যেখানেই হোক, প্রায় সব জাগাতেই সবগুলোর উত্তর এক চান্সেই পেয়েছি। কোথাও আমাকে কোন প্রশ্ন রিপিট করতে হয়নি। তার মানে প্রতিটি জাগাতেই আমার সবগুলো প্রশ্নই মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়েছে। অথচ এই সমস্যাটা আমি প্রায় প্রতিটা বাংলাদেশীর সাথেই ফেইস করেছি। আমি বুঝি না সমস্যাটা ঠিক কোন জাগায়।
আমার ধারনা, এই দেশের লোকজন (দোকান/অফিস/সেবা প্রতিষ্ঠানে) প্রশ্নকারী/গ্রাহকদের প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনে না। এই অভ্যাসটাই তাদের নাই। তারা ধরেই নেয়, কাষ্টমার একটা একটা করে প্রশ্ন করবে আর তারা একটা একটা করে উত্তর দিবে। তাই শুধু প্রথম বা শেষ প্রশ্নটা মনোযোগ দিয়ে শুনে। বাকীগুলো তারা খেয়াল করে না। এই কারনেই বাকীগুলোর উত্তরও তারা দিতে পারে না।
অথচ ভালো কাষ্টমার সার্ভিস দিতে হলে গ্রাহকদের সব প্রশ্ন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনাটা আয়ত্ব করতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। কেউই আপনার সুবিধের জন্য বার বার প্রশ্ন করতে চাইবে না। আর কারো সাথে এমনটা হয়েছে কিনা জানি না। তবে আমার ক্ষেত্রে প্রায়ই হয়। আমাদের ভেতর প্রফেশনালিজিমের বড়ই অভাব।
মুখে জিগেস করলেও এই অবস্থা। লিখে জিগেস করলেও একই অবস্থা। ইনবক্সে একজনকে ৪টা প্রশ্ন করলাম। সে দুটোর উত্তর দিয়ে উধাও। এক প্রশ্ন একাধিকবার করাটা অত্যন্ত বিরক্তিকর একটা ব্যাপার।
আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো একজন শ্রোতা। মানুষের কথা, বিশেষ করে আমাকে করা কোন প্রশ্ন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনি। তাই স্বভাবতই আমি আশা করি, মানুষজনও আমার প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনবে। কিন্তু আশা পুরাই হতাশায় রুপ নেয় যখন একই প্রশ্ন কয়েকবার করে করতে হয়। মানুষজনের মনোযোগের এত অভাব কেন কে জানে!
প্রথম প্রকাশঃ ফেসবুক – নভেম্বর, ২০১৭ ইং।
আজ বসের বাসায় ইফতারি পার্টির পর বন্ধুকে সাথে নিয়ে মিরপুর ১০ এর ফ্যাশন হাউজগুলোতে শার্ট কিনতে গেছি, কিন্তু যা দেখি কিছুই পছন্দ হয় না। শেষমেষ ’বেড়ালের চোখের’ একটা হাফহাতা শার্ট পছন্দ হলো কিন্তু সাইজ হয় না। তো বাধ্য হয়ে অন্য শার্ট চয়েস করলাম। সেটারও একই অবস্থা, সাইজ নাই। মুটামুটি যেটা ধরি সেটাই নাকি আমার সাইজ হয় না। আমার লাগবে ১৭ সাইজ, অথচ দোকানের সবচাইতে বড় সাইজ হচ্ছে সাড়ে ষোলো।
শেষে, এটেনডেন্ট মেয়েটা ৩২টা দাতঁ কেলিয়ে আমাকে বল্ল- ’স্যার কিছু মনে করবেন না, একটা কথা বলি। আপনার সাইজ পাবেন না মনে হয়। আপনার জন্য বেটার হয় যদি কাপড় কিনে নিজের পছন্দমতো বানিয়ে নেন।’ শুনে পিত্তি জ্বলে গেলো আমার! ফ্যাশন হাউজগুলো যেভাবে কাষ্টমারদের অপমান করা শুরু করেছে, সত্যি সত্যিই এমন একদিন আসবে যখন হাতাহাতি করার প্রিপারেশন নিয়ে শপিংয়ে যাইতে হবে, অবস্থাদৃষ্টে যা দেখতেছি!
বল্লাম, ’আপনাদের কাছে এভেইলেবল সাইজ নাই এই কারনে এখন আমাকে দর্জির কাছে ছুটিতে হবে নাকি? বেশ তো, এখন থেকে আপনারা থান কাপড়ও বিক্রি শুরু করেন না হয়।’ বন্ধু আমাকে হাত ধরে টেনে বের করে নিয়ে গেলো দোকান থেকে। নাহলে এর একটা হেস্ত ন্যাস্ত করে ছাড়তাম।
যা বুঝলাম, এই আকালের দিনে খানিকটা স্ফিত শরীর একটা বাড়তি অভিশাপ। আর বিভিন্ন বুটিক হাউজগুলা ঈদের সময় পার্টটাইম ছেলে মেয়ে নেয় ১ মাসের চুক্তিতে, এদের না আছে কোন পেশাদারিত্ব, না আছে গ্রাহকদের প্রতি সন্মান! আর যদি কোনদিন গেছি বেড়ালের চোখে! -_-
প্রথম প্রকাশঃ ফেসবুক – জুন, ২০১৬ ইং।


